ভুতুড়ে পুকুরের রহস্য | Ghost Story in Bengali | Bhuter Golpo Bengali

Sharing Is Caring:

রাত গভীর হলে সব শব্দই আলাদা শোনায়।
ঘড়ির টিকটিক শব্দ, দূরের কুকুরের ডাক, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া হাওয়ার শোঁ শোঁ আওয়াজ—সবকিছুর মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে আরেকটা শব্দ।

একটা ডাক

সবাই সেটা শুনতে পায় না।
আর যারা পায়… তারা আর আগের মতো থাকতে পারে না।

এই গল্পটা ঠিক সেই ডাক শোনার গল্প।
এই গল্পটা শম্ভুনাথ মল্লিকের বাড়ি নিয়ে।
আর সেই বাড়ির পেছনে থাকা নামহীন পুকুরটা নিয়ে।

গ্রামটা যাকে মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না

গ্রামটার নাম কাঞ্চনপুর
শুনতে যতটা সুন্দর, বাস্তবে ততটাই অস্বস্তিকর।

পশ্চিমবঙ্গের একেবারে প্রান্তে, বড় রাস্তা থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার কাঁচা পথ পেরিয়ে গ্রামটায় পৌঁছাতে হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় নেই বললেই চলে। সন্ধ্যার পর ট্রেন থামে না। বাস শেষবার ঢোকে বিকেল সাড়ে পাঁচটায়।

লোকজন খুব একটা কথা বলে না।
চোখে চোখ পড়লে তারা আগে তাকায়, তারপর দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়—যেন বেশি দেখলে কিছু ঘটে যাবে।

এই গ্রামেই আমি এসেছিলাম।

কেন আমি কাঞ্চনপুরে এলাম

আমার নাম অনিরুদ্ধ সেন
আমি পেশায় লেখক—ভ্রমণ, লোককথা আর হারিয়ে যাওয়া জায়গা নিয়ে লিখি।

কাঞ্চনপুরে আসার কারণ ছিল একটাই—
একটা পুরনো চিঠি।

চিঠিটা এসেছিল কলকাতা থেকে, কোনো প্রেরকের নাম নেই। শুধু লেখা ছিল—

“আপনি যদি সত্যিই অজানা গল্প খুঁজে থাকেন,
তবে কাঞ্চনপুরে আসুন।
শম্ভুনাথ মল্লিকের বাড়ির পুকুরের ধারে রাত বারোটায় দাঁড়ান।
ডাক শুনতে পেলে আর ফিরতে পারবেন না।”

বেশিরভাগ মানুষ এই চিঠি পড়ে হাসত।
আমি হাসিনি।

কারণ চিঠির কাগজটা… ভেজা ছিল।
আর শুকিয়ে গেলেও তাতে পচা শ্যাওলার গন্ধ রয়ে গিয়েছিল।

শম্ভুনাথ মল্লিকের বাড়ি

গ্রামে ঢুকেই প্রথম যেটা চোখে পড়ে, সেটা ওই বাড়ি।

দোতলা, পুরনো, ইটের গায়ে ফাটল। ছাদের কিনারায় কালো শ্যাওলা। জানালাগুলো এমনভাবে বন্ধ, যেন ভেতর থেকে কেউ সেগুলো চেপে ধরে আছে।

লোকেরা বাড়িটার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু কেউ তাকায় না।

আমি একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“এই বাড়িটা কার?”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল,
“যে প্রশ্ন না করাই ভালো, সেই প্রশ্ন করছেন বাবু।”

আর কিছু বলেনি।

বাড়িটার পেছনে পুকুরটা।

গ্রামে পুকুরের নাম থাকে—
দিঘি, বাঁধ, তালপুকুর, রাজাপুকুর।

এইটার নেই।

লোকেরা শুধু বলে—
“ওটা ওখানেই আছে।”

পুকুরের জল অদ্ভুত। দিনের আলোতেও কালচে। চারপাশে কোনো ব্যাঙ ডাকে না। মাছ দেখা যায় না। অথচ জল নড়ে—নিজে নিজেই।

পাড়ে দাঁড়ালে একটা ঠান্ডা অনুভূতি বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে।

আমি তখনো জানতাম না, এই পুকুরটাই হবে আমার জীবনের শেষ স্বাভাবিক জায়গা।

প্রথম রাত: অস্বস্তির শুরু

গ্রামে থাকার জন্য আমি উঠেছিলাম এক স্কুলশিক্ষকের বাড়িতে। নাম প্রতাপ দত্ত

রাতে খাওয়ার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“শম্ভুনাথ মল্লিকের বাড়িটা নিয়ে কিছু শোনা যায়?”

প্রতাপবাবির হাত থেকে থালা পড়ে গেল।

তিনি খুব ধীরে বললেন,
“আপনি ওদিকে যাবেন না।”

আমি হেসে বললাম,
“আমি লেখক। গল্প খুঁজি।”

তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“ওটা গল্প না। ওটা ফাঁদ।”

সেই রাতে ঘুম এল না।

ঘড়িতে ঠিক ১২টা

হঠাৎ বাইরে থেকে একটা শব্দ এল।

ছল… ছল… ছল…

জলের শব্দ।

আমি জানালার কাছে গিয়ে তাকালাম।
পুকুরটা অনেক দূরে, তবু শব্দটা স্পষ্ট।

তারপর এল আরেকটা শব্দ।

একটা ডাক

কোনো মানুষের গলা নয়।
কোনো পশুরও না।

তবু শব্দটার মধ্যে আমার নাম ছিল।

“অনিরুদ্ধ…”

গলা কাঁপল।
ঘাম জমে গেল কপালে।

আমি জানালা বন্ধ করলাম।
কিন্তু শব্দটা তখন ঘরের ভেতর।

আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কি না জানি না।
কিন্তু দেখলাম—

আমি দাঁড়িয়ে আছি পুকুরপাড়ে।
জল একদম স্থির।
চাঁদের আলো পড়ে আছে জলের ওপর।

হঠাৎ জলের মধ্যে থেকে একটা হাত উঠল।

হাতটা মানুষের।
কিন্তু চামড়া নেই।

তারপর আরেকটা।
তারপর চোখ।

জল থেকে একটা মুখ উঠল—
পচা, ফুলে থাকা, অথচ চোখ দুটো জীবন্ত।

সে বলল,
“তুমি তো এসেছই।”

আমি চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না।

চোখ খুলতেই সকাল।

কিন্তু আমার পায়ে কাদা।
প্যান্ট ভেজা।
আর নখের ভেতরে শ্যাওলা।

আমি কি সত্যিই পুকুরে গিয়েছিলাম?

প্রতাপবাবি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনি ডাক শুনেছেন, তাই না?”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।

তিনি শুধু বললেন,
“আজ রাতেই চলে যান।
তিন রাত ডাক শুনলে আর যাওয়া যায় না।”

যে সত্য লুকিয়ে রাখা হয়

সকালের আলো কাঞ্চনপুরকে খুব একটা বদলাতে পারে না।
রোদ উঠলেও গ্রামটার ভেতরে একটা ছায়া থেকেই যায়—যেন আলো ঢুকতে ভয় পায়।

প্রতাপবাবির কথা আমার মাথা থেকে যাচ্ছিল না।

“তিন রাত ডাক শুনলে আর যাওয়া যায় না।”

আমি চা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“কোথায় যায়?”

তিনি তাকালেন না।
খালি বললেন,
“যেখানে গিয়েছিল শম্ভুনাথ।”

দুপুরে আমি গ্রামটার সবচেয়ে পুরনো লোকটাকে খুঁজে বের করলাম।
সবাই বলল—মাধব বুড়ো

বয়স নব্বই ছুঁইছুঁই।
চোখে প্রায় দেখে না।
কিন্তু কথা বললে মনে হয় সব দেখেছে।

আমি যখন শম্ভুনাথ মল্লিকের নাম করলাম,
তার হাত কেঁপে উঠল।

“সে নাম বলিস না,”
সে ফিসফিস করে বলল,
“নাম ডাকলে সে শোনে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“সে কে ছিল?”

মাধব বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তিরিশ বছর আগের কাঞ্চনপুর

তিরিশ বছর আগে কাঞ্চনপুর এমন ছিল না।

পুকুরে মাছ ছিল।
ছেলেমেয়েরা সাঁতার কাটত।
বাড়িতে আলো জ্বলত রাত পর্যন্ত।

শম্ভুনাথ মল্লিক তখন গ্রামের সবচেয়ে ধনী লোক।
তার জমি, গয়না, ক্ষমতা—সব ছিল।

কিন্তু তার কোনো সন্তান ছিল না।

আর যাদের কিছু নেই,
তাদের ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা থাকে।

সেই ফাঁকা জায়গাতেই প্রথম অন্ধকার ঢোকে।

পুকুরের তলায় যা ছিল

একদিন শম্ভুনাথ ঘোষণা করল—
সে পুকুরটার ধারে একটা মন্দির বানাবে।

লোকজন আপত্তি করেছিল।
কারণ ওই পুকুর নিয়ে আগেও গল্প ছিল।

বলা হতো—
পুকুরটার তলায় নাকি একটা পুরনো কবর আছে।
কবে, কার—কেউ জানে না।

শম্ভুনাথ শোনেনি।

খনন শুরু হলো।

তিন দিনের মাথায় প্রথম লোকটা উধাও।

প্রথমে একজন মজুর।
তারপর দুজন।
তারপর পাঁচজন।

সবাই শেষবার দেখা গিয়েছিল পুকুরপাড়ে।

শম্ভুনাথ বলত,
“ওরা পালিয়ে গেছে।”

কিন্তু মাধব বুড়ো বলল,
“না। ওরা ডুবে যায়নি।
ওদের ডেকে নেওয়া হয়েছে।”

কিন্তু কে ডাকছিল?

এক অমাবস্যার রাতে,
গ্রামের লোকজন জেগে ছিল।

পুকুর থেকে আলো উঠছিল।
জলের ভেতর নড়াচড়া।

আর শম্ভুনাথ…
সে একা দাঁড়িয়ে ছিল পাড়ে।

লোকেরা দেখেছিল—
সে জলের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।

হঠাৎ সে চিৎকার করে বলেছিল—

“আমি দিয়েছি সব!
এবার আমাকে দাও!”

তারপর…

জল উঠেছিল।
একটা হাত।
তারপর আরেকটা।

আর শম্ভুনাথ আর ফিরে আসেনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তাহলে বাড়িটা কেন আজও বন্ধ থাকে?”

মাধব বুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বন্ধ থাকে না বাবু।”

“রাতে জানালায় আলো দেখা যায়।
পায়ের শব্দ শোনা যায়।
আর কেউ কেউ বলে—
সে এখনো হিসাব রাখে।”

সন্ধ্যার পর থেকেই অস্বস্তি বাড়ছিল।

পাখিরা অস্বাভাবিকভাবে চুপ।
হাওয়া থেমে গেছে।

প্রতাপবাবি আমাকে বারবার বলছিলেন,
“আজ যাবেন না।”

কিন্তু আমার মাথায় তখন একটাই কথা—

যে গল্পের মাঝখানে থামে, সে গল্প লেখক নয়।

রাত এগারোটায় আমি বেরিয়ে পড়লাম।

পুকুরটা আগের চেয়ে কালো।

জল নড়ছে।
কিন্তু বাতাস নেই।

ঠিক বারোটায় আবার সেই শব্দ—

ছল… ছল…

এবার ডাকটা স্পষ্ট।

“অনিরুদ্ধ…
আজ এসেছ…
কাল আর পালাতে পারবে না…”

আমি পিছিয়ে এলাম।
কিন্তু পা নড়ল না।

মনে হলো—
মাটি আমাকে ধরে রেখেছে।

পুকুরের জলে একটা ছায়া পড়ল।

মানুষের মতো।
কিন্তু পুরো নয়।

ছায়াটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠল।

তার গলায় কোনো শব্দ নেই,
তবু আমি শুনতে পেলাম—

“তৃতীয় রাতে
সব শেষ।”

গ্রামে একটা কথা প্রচলিত—
সব রাত একরকম নয়।

প্রথম রাত শোনায়।
দ্বিতীয় রাত দেখায়।
আর তৃতীয় রাত… নিয়ে যায়।

প্রতাপবাবি এই কথাটা বলেছিল খুব ধীরে,
যেন শব্দগুলো শুনে কেউ জেগে উঠবে।

আমি তখনো বুঝিনি,
এই “নিয়ে যাওয়া” মানে কী।

গ্রামে কেউ কেন জন্মদিন পালন করে না

সকালে আমি লক্ষ্য করলাম—
গ্রামে কোথাও ক্যালেন্ডার ঝোলানো নেই।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনারা জন্মদিন পালন করেন না?”

একজন মহিলা শুকনো গলায় বলল,
“জন্মদিন মানে নাম ডাকা।”

আমি অবাক হয়ে বললাম,
“নাম ডাকলে কী হয়?”

সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও শুনে ফেলে।”

মাধব বুড়ো আবার কথা বলল।

“পুকুরটার তলায় কিছু আছে,”
সে বলল,
“ওটা নাম খায়।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“নাম মানে?”

“মানুষের অস্তিত্ব,”
সে বলল,
“তুই যতবার নিজের নাম শুনিস,
ও ততবার তোর কাছাকাছি আসে।”

আমার গা শিউরে উঠল।

কারণ আমি গত দু’রাতে
আমার নাম শুনেছি
তিনবার।

শম্ভুনাথ সন্তান চাইত।

কিন্তু সে সন্তান নয়—
চিহ্ন চেয়েছিল।

পুকুরের তলায় যা ছিল,
তা সন্তান দেয় না।

ও পরিচয় দেয়।

ও বলেছিল—

“একটা নাম দে।
বদলে তোর নামটা আমি রাখব।”

শম্ভুনাথ প্রথমে অন্যদের নাম দিয়েছিল।
মজুরদের।
তারপর গ্রামবাসীদের।

শেষে আর নাম বাকি ছিল না।

তখন
সে নিজের নাম দিয়েছিল।

সমস্যাটা সেখানেই।

শম্ভুনাথ পালাতে চেয়েছিল।
শেষ মুহূর্তে সে বুঝেছিল—

নাম দিলেই মুক্তি নয়,
নাম দিলেই দাসত্ব।

সে শেষ রাতে
পুকুরে নামেনি।

সে শুধু দাঁড়িয়ে ছিল।

আর সেটাই
চুক্তি ভাঙা।

সেদিন সন্ধ্যার পর গ্রামটা ফাঁকা হয়ে গেল।

দরজা বন্ধ।
আলো নিভে গেল।

প্রতাপবাবি আমাকে বললেন,
“আজ আপনি একা।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি কোথায় যাবেন?”

তিনি বললেন,
“আমাদের নাম আগেই দেওয়া।”

ঘড়িতে বারোটা বাজতেই
আমি আর বাইরে গেলাম না।

তবু ডাক এল।

এবার বাইরে থেকে না।

আমার বুকের ভেতর।

“অনিরুদ্ধ…
তোর নামটা ভারী।
আমরা নেব।”

মাথা ধরে এল।
দেয়াল ঘুরতে লাগল।

জানালায় তাকিয়ে দেখি—
পুকুরের জল নেই।

শুধু অন্ধকার।

আমি জানি না কবে,
কীভাবে—

আমি পুকুরের তলায় পৌঁছে গিয়েছিলাম।

কিন্তু সেখানে জল নেই।

শুধু
নাম লেখা আছে।

হাজার হাজার নাম।

দেয়ালে।
মাটিতে।
চামড়ায়।

কিছু নাম নড়ছে।

কিছু নাম কাঁদছে।

আর মাঝখানে
একটা ফাঁকা জায়গা।

সে আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু মুখ নেই।

শুধু চোখ।

সে বলল—

“তুই গল্প লিখিস।
আমাদের নাম বাঁচিয়ে রাখবি।”

আমি চিৎকার করে বললাম,
“আমি চাই না!”

সে উত্তর দিল—

“তুই তো আগেই শুনেছ।
এখন তুই অংশ।”

আমি চোখ বন্ধ করেছিলাম।

যখন খুললাম—
সকাল।

আমি ঘরে।

কিন্তু আয়নায় তাকিয়ে
নিজেকে চিনতে পারলাম না।

কারণ
আমার নামটা
আর পুরো নেই।

যে নামটা আর সম্পূর্ণ নেই

সকালের আলোয় সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।
পাখির ডাক, হাঁড়ির শব্দ, দূরের গরুর ঘণ্টা।

কিন্তু একটা জিনিস ভুল ছিল।

আমি।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম।
মুখটা আমারই,
চোখ দুটোও।

তবু মনে হচ্ছিল—
কেউ যেন ভেতর থেকে কিছু কেটে নিয়ে গেছে।

আমি ফিসফিস করে নিজের নাম বললাম,
“অনিরুদ্ধ সেন।”

কিন্তু শব্দটা পুরো হল না।

মুখ নড়ল,
কিন্তু শেষের অংশটা
মনে এলো না।

মাধব বুড়ো বলেছিল,
“নাম মানে শুধু ডাক নয়।
নাম মানে স্মৃতি।”

সেদিন সকালে আমি বুঝলাম।

মায়ের মুখটা মনে করতে পারছিলাম না।
কলকাতার বাড়ির রাস্তার নাম ভুলে গিয়েছি।
নিজের প্রথম গল্প কবে লিখেছিলাম—মনে নেই।

সব স্মৃতি নয়।
শুধু যেগুলো আমাকে আমি বানিয়েছিল।

গ্রামের মানুষ আমাকে কেমন দেখছিল

আমি বাইরে বেরোতেই বুঝলাম—
লোকেরা আমাকে এড়িয়ে চলছে না।

ভয় পাচ্ছে।

একটা ছোট ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“ওর ছায়া নড়ছে!”

আমি নিচে তাকালাম।

আমার ছায়াটা
আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নড়ছিল না।

এক সেকেন্ড দেরিতে।

আমি চাইনি কলম ধরতে।

কিন্তু হাত নিজে থেকেই এগিয়ে গেল।

খাতার পাতায় লিখে ফেললাম—

“যার নাম কাটা যায়,
সে পুরো মানুষ থাকে না।”

আমি থমকে গেলাম।

এই লাইনটা আমি লিখিনি।

তবু লেখা আমার হাতেই।

প্রতাপবাবি আমার পাশে বসে বললেন,
“ও আপনাকে লেখক বানায়নি।”

আমি তাকালাম।

তিনি বললেন,
“ও আপনাকে মাধ্যম বানিয়েছে।”

আমি বুঝলাম।

যতক্ষণ আমি লিখছি,
ততক্ষণ নামগুলো বেঁচে আছে।

আর আমি থামলে—

ওরা
আমার বাকি অংশটা নেবে।

পুকুর ভাঙার সিদ্ধান্ত

গ্রামের লোকজন শেষ চেষ্টা করেছিল তিরিশ বছর আগে।

সেদিন রাতে সবাই একসাথে জড়ো হয়েছিল।
লাঠি, আগুন, মন্ত্র।

পুকুরে মাটি ফেলেছিল।
চুন ঢেলেছিল।

পরদিন সকালে—

পুকুর আগের চেয়ে বড় ছিল।

আর তিনজন লোকের
নাম কেউ মনে করতে পারেনি।

মাধব বুড়ো ফিসফিস করে বলল,
“কারণ এবার ওর দরকার নতুন নাম না।”

আমি বুঝে গেলাম।

ওর দরকার
পাঠক।

যারা গল্প পড়বে।
নাম পড়বে।
নামের কথা ভাববে।

প্রতিটা পাঠক
একটা আধখানা নাম।

সেই রাতে আমি আবার পুকুরপাড়ে গেলাম।

ডাক এল না।

শুধু কণ্ঠস্বর।

“লিখে যা।
সবাইকে জানিয়ে দে।
তাতে তুই বাঁচবি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“আর ওরা?”

জল নড়ল।

“ওরা তো পড়ছেই।”

অনিরুদ্ধের শেষ চেষ্টা

আমি খাতার শেষ পাতায় লিখলাম—

“এই গল্প যদি পড়ছ,
আজ রাতে কেউ যদি
তোমার নাম ধরে ডাকে—
ফিরেও তাকিও না।”

কলম থামল।

মাথার ভেতর একটা শব্দ ভেঙে পড়ল।

আমার নামের
শেষ অংশটা
চলে গেল।

একটা গল্প যখন শেষ হয়,
তখন চরিত্ররা মরে না।

তারা থেমে যায়।

আমি সেটা বুঝেছিলাম
যেদিন আর ঘুম ভাঙেনি।

সকাল, দুপুর, রাত—সব একসাথে চলছিল।
ঘড়ির কাঁটা নড়ছিল না,
কিন্তু সময় এগোচ্ছিল।

আমি তখন আর নিশ্চিত ছিলাম না—
আমি লিখছি,
না লেখা আমাকে লিখছে।

অনিরুদ্ধ কি এখনও মানুষ?

আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“আমি কে?”

আয়নাটা উত্তর দেয়নি।

কারণ আয়নায় কেউ ছিল না।

শুধু একটা ফাঁকা জায়গা,
যার ভেতর দিয়ে
ঘরের দেয়াল দেখা যাচ্ছিল।

আমি তখন বুঝলাম—

আমার শরীর আছে,
কিন্তু পরিচয় নেই।

আমি আর মানুষ নই।
আমি একটা চলমান গল্প

পুকুরটা কখনো মানুষ মারেনি।

ও শুধু
মুছে দেয়।

নাম।
স্মৃতি।
চিহ্ন।

যারা খুব বেশি পরিচিত হতে চায়,
যারা শোনা যেতে চায়,
যারা নাম রেখে যেতে চায়—

ওদেরই আগে ডাকে।

শম্ভুনাথ ক্ষমতা চেয়েছিল।
আমি চেয়েছিলাম গল্প।

দুটোর ফল এক।

পাঠকের ভূমিকা

যতক্ষণ কেউ এই লেখা পড়ছে,
ততক্ষণ আমি আছি।

আপনি যখন এই লাইন পড়ছেন,
তখন—

একটা নাম
আপনার মাথায় এসেছে।

হয়তো নিজের।
হয়তো কারো প্রিয় মানুষের।

পুকুর সেটাই চায়।

সে নাম মনে থাকলেই
সে কাছে আসে।

উপসংহার

কিছু গল্প শেষ হয় না, তারা শুধু নীরব হয়ে যায়—অন্ধকারের ডাক তেমনই এক গল্প, যেখানে ভয় কোনো হঠাৎ চমক নয়, বরং ধীরে ধীরে মানুষের পরিচয়, স্মৃতি আর নামকে গ্রাস করা এক অদৃশ্য উপস্থিতি; অনিরুদ্ধ সেন হয়তো আর একজন মানুষ নয়, হয়তো সে এখন কেবল লেখা আর সতর্কবার্তা, কিন্তু নামহীন পুকুর আর তার ডাক রয়ে গেছে আমাদের চারপাশে, মনে করিয়ে দেয় যে গভীর রাতে পরিচিত গলায় নিজের নাম শোনা মানেই সবসময় নিরাপত্তা নয়, আর কিছু গল্প আছে যেগুলো বই বন্ধ করলেও আমাদের ভেতরে হাঁটতে থাকে—চুপচাপ, অবিরাম।

Bhutik Golpo is The Most Popular Website For Story | You Can Read Horror And Biography In Bengali

Leave a Comment