ভূমিকা :
“প্রাচীন কাহিনিগুলো কখনও মিথ্যে হয় না…
কিছু গল্প থাকে যেগুলো গ্রামের মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়…
যেমন এই গল্পটা — এক ‘কুয়ো’ নিয়ে।
একটা কুয়ো, যার জলে কেউ একবার মুখ দেখলে…
আর কখনও ফিরে আসে না…”
অধ্যায় ১: বদলির চিঠি
আমার নাম অরুণাভ মুখার্জি।
পেশায় সরকারী ইঞ্জিনিয়ার।
একটি জল সরবরাহ প্রকল্পের দায়িত্বে আমাকে পাঠানো হয়েছিল বেলতলা নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে।
শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম, যেখানে এখনও বিদ্যুৎ পুরোপুরি পৌঁছয়নি।
পথ কাঁদামাটির, গাছপালায় ঢাকা,
রাত নামলেই পুরো গ্রাম ডুবে যায় অন্ধকারে।
প্রথম দিন অফিসে পৌঁছেই শুনলাম —
গ্রামের পানীয় জলের সমস্যা নাকি বহুদিনের।
পুরনো কুয়ো নষ্ট, নতুন কুয়ো খোঁড়া হয়েছিল, কিন্তু সেই কুয়োর জল কেউ ব্যবহার করে না। (Bhutik Story)
কারণ?
গ্রামের লোকেরা বলে —
“ওই কুয়োটা অভিশপ্ত… ওখানে নাকি আত্মা থাকে…”
আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম।
কাজ তো কাজই, কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না।
অধ্যায় ২: গ্রাম আর কুয়ো
পরদিন সকালে আমি সাইটে গেলাম।
গ্রামটা ছোট — বাঁশঝাড়, কাঁচা রাস্তা, দু’টো দোকান আর একটা পুরনো শিবমন্দির।
কুয়োটা মন্দিরের পিছনে, বড় বড় পাথর দিয়ে ঘেরা।
চারপাশে ঘাসে ঢাকা, আর একটা গন্ধ —
পচা জলের মতো, কিন্তু অন্যরকম,
যেন ধূপ আর কাদা মিশে একসাথে পচছে। (Bhutik Story)
গ্রামের পুরনো লোক, বৃদ্ধ হরিধন দাস, পাশে এসে বললেন—
“সাবধান বাবু, ওই কুয়োর কাছে বেশিক্ষণ দাঁড়াবেন না।”
আমি হাসলাম — “কেন? জলে সমস্যা আছে বুঝি?”
“জল নয় বাবু… ওখানে মানুষ টান পড়ে যায়। যেই মুখটা জলের দিকে নিচু করে তাকায়… ওর মুখ নাকি জলে দেখা যায় না। দেখা যায়… অন্য কারও।”
আমি অবাক হলাম।
“অন্য কারও?”
হরিধন নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন।
তারপর চলে গেলেন।
অধ্যায় ৩: তদন্তের শুরু
রাতের বেলা অফিসে ফিরে কুয়োর ব্লুপ্রিন্ট দেখতে লাগলাম।
রেকর্ডে লেখা —
“কুয়ো খোঁড়া হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। শ্রমিকের মৃত্যুর কারণে কাজ বন্ধ।”
কিন্তু মৃত্যুর কারণের ঘরে লেখা শুধু — “Accidental fall.”
পরের দিন আরও খোঁজ নিয়ে জানলাম,
সেই সময় একজন শ্রমিক কুয়োর ভেতর পড়ে মারা যায়।
শবটা কখনও উদ্ধার হয়নি।
গ্রামবাসীরা বলে —
“তার আত্মা এখনও ওখানেই আটকে আছে।”
অধ্যায় ৪: রাতের গন্ধ
তৃতীয় রাতে আমার থাকা জায়গা ছিল অফিস কোয়ার্টারে।
বাইরে তখন বিদ্যুৎ নেই, শুধু হ্যারিকেনের আলো।
হঠাৎ বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ — ভিজে মাটি আর ধূপের মিশ্রণ।
জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম,
একটা কালো ছায়া কুয়োর দিক থেকে আসছে।
ধীরে ধীরে সে এগিয়ে এল…
চোখে মনে হল, ছায়াটা যেন ভেসে আসছে,
পায়ের নিচে মাটি নেই।
আমি দৌড়ে দরজা বন্ধ করলাম।
পরদিন সকালে বেরিয়ে দেখি —
জানালার ধারে কাদা আর জলের ফোঁটা পড়ে আছে।
কিন্তু বৃষ্টি তো হয়নি!
অধ্যায় ৫: মাধবী
গ্রামের স্কুলে নতুন শিক্ষিকা এসেছেন — নাম মাধবী সেন।
আমার মতোই শহর থেকে এসেছেন।
একদিন কথা প্রসঙ্গে বললেন,
“আপনি জানেন, এই কুয়ো নিয়ে আমি একটা প্রজেক্ট করতে চাই। শুনেছি, ৩০ বছর আগে এখান থেকে এক মেয়েও নিখোঁজ হয়েছিল।”
“কে?” — আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“ওর নাম ছিল পারুল। গ্রামের লোকেরা বলে, কুয়োর ধারে তাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল।”
আমি বললাম, “আপনি এসব নিয়ে ঘাঁটছেন কেন? বিপদ হতে পারে।”
মাধবী হেসে বললেন,
“ভয় পেলে তো শিক্ষক হওয়া যায় না, মি. মুখার্জি।” (Sunday Suspense)
অধ্যায় ৬: পুরনো ডায়েরি
একদিন হরিধনের নাতি এসে বলল,
“দাদু মারা যাওয়ার আগে একটা ডায়েরি রেখে গেছেন, বলেছিলেন এটা বাবুকে দিতে।”
ডায়েরিটা খুলে দেখি লেখা —
“আজ রাতেও কুয়োর জল কাঁপছে। মনে হয় কেউ ডাকছে।
পরশু রাতে বৌদি বলল, কুয়োর জলে নিজের মুখ দেখতে পায়নি।
অন্য একজন হাসছিল ওর মুখে…”
পাতা উলটে দেখি —
শেষ পৃষ্ঠায় রক্তের দাগের মতো কালো দাগ, আর লেখা —
“ও ফিরে এসেছে। কুয়ো আবার খিদে পেয়েছে…”
অধ্যায় ৭: অদ্ভুত শব্দ
রাত ১২টা।
বাইরে নিস্তব্ধতা।
আমি কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি, মাধবী আমার সঙ্গে।
হঠাৎ কুয়োর জল নড়ে উঠল, যেন কেউ নিচ থেকে ঠেলে দিচ্ছে।
তারপর ধীরে ধীরে ভেসে উঠল একটা পুরনো কাপড় —
একটা লাল ওড়না।
মাধবী কেঁপে উঠল — “ওই তো! পারুলের ওড়না! ছবিতে দেখেছিলাম।”
ঠিক তখনই কুয়োর ভেতর থেকে একটা হাত বেরোল —
ফ্যাকাশে, সাদা, হাড়ের মতো।
আমি ঝাঁপিয়ে মাধবীকে টেনে সরালাম।
হাতটা আবার জলে ডুবে গেল।
বাতাসে ধূপের গন্ধ আরও ভারী হয়ে উঠল।
অধ্যায় ৮: গ্রামের আতঙ্ক
পরদিন সকাল থেকেই গ্রামে তোলপাড়।
মানুষ বলছে — “কুয়ো আবার জেগেছে!”
কেউ কেউ বলছে, রাতের বেলা কুয়োর জলের ভেতর একটা মুখ হাসছিল।
গ্রামের মন্দিরে পূজা শুরু হল।
আমাকে গিয়ে গোপনে বলল এক বুড়ো মহিলা —
“বাবু, ও জল মানুষ চায়… যার কপালে লেখা আছে, তাকেই টানে।”
আমি ভাবলাম, এটা মানসিক প্রভাব, কুসংস্কার।
কিন্তু তখনও জানতাম না,
পরের রাতটা আমার জীবনের শেষ স্বাভাবিক রাত হবে।
অধ্যায় ৯: গভীর রাতের ডাক
রাত দুইটা।
জানলার বাইরে আবার সেই গন্ধ।
একটা কণ্ঠস্বর —
“অরুণাভ… নিচে এসো… জল চাই…”
আমি উঠে বাইরে তাকালাম।
দেখি, মাধবী দাঁড়িয়ে আছে কুয়োর ধারে, সাদা শাড়ি পরা, মুখে হাসি।
আমি চিৎকার করলাম — “মাধবী! দূরে থাকো!”
কিন্তু সে ধীরে ধীরে জলের দিকে নিচু হয়ে গেল।
তার মুখটা জলে প্রতিফলিত হলো —
কিন্তু ওটা মাধবীর মুখ নয়! (Sunday Suspense)
ওটা ছিল এক বিকৃত, বিকলাঙ্গ মুখ, চোখ নেই, শুধু কালো গর্ত।
আমি দৌড়ে গেলাম, কিন্তু তার আগেই —
মাধবী কুয়োর ভেতর পড়ে গেল।
আমি চিৎকার করলাম, টর্চ ফেললাম জলে…
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
অধ্যায় ১০: শেষ ডুব
পরদিন উদ্ধার অভিযান হল।
কুয়োর ভেতরে কেউ নেই, শুধু একটুকরো কাপড়।
তবে হরিধনের ডায়েরির পাতা আবার ওল্টানো, তাতে লেখা —
“ও ফিরে এসেছে, এবার ও নিজের মুখ খুঁজছে…”
আমি আর থাকতে পারলাম না।
ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখন অফিসের লোকেরা বলল —
“স্যার, মাধবী ম্যাডাম নাকি আজ সকালে স্কুলে দেখা গেছে।”
আমি হতবাক।
দৌড়ে স্কুলে গেলাম।
দেখি, সত্যিই মাধবী ক্লাসে পড়াচ্ছে।
কিন্তু সে আমাকে দেখে থামল,
আর ঠান্ডা গলায় বলল —
“আমার মুখটা কেমন হয়েছে অরুণাভ? জলে দেখলে ঠিক চিনতে পারবে তো?”
আমি কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে এলাম।
তার মুখের এক পাশে ফাটা দাগ, আর চোখের মণি অদ্ভুত ভাবে নড়ছে — যেন জলের ভেতর থেকে কেউ তাকিয়ে আছে।
অধ্যায় ১১: নীরব সমাপ্তি
রাতের শেষ দিকে আমি ব্যাগ গুছিয়ে চলে এলাম বেলতলা থেকে।
শেষবার যখন ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকালাম,
দেখলাম দূরে সেই কুয়োটা, মন্দিরের পিছনে…
আর তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে মাধবী, লাল ওড়না পরা, ঠোঁটে হাসি।
তার মুখের দিক থেকে ধীরে ধীরে গড়িয়ে নামছে একটা জলের ফোঁটা…
যা মাটিতে পড়ার আগেই মিলিয়ে গেল।
শেষ বর্ণনা :
“কিছু জায়গা আছে, যেখানে জল শুধু তৃষ্ণা মেটায় না…
ওরা খিদে মেটায় আত্মা দিয়ে।
তাই যদি কখনও কোনও পুরনো গ্রামের পথে এমন একটা কুয়ো দেখেন,
যেখানে বাতাসে ধূপের গন্ধ,
আর জল অদ্ভুত ভাবে কাঁপছে…
দয়া করে মুখটা নিচু করবেন না।
কারণ, আপনি হয়তো আপনার মুখ দেখবেন না…
দেখবেন… অন্য কারও।”
Read More Story
কুয়াশার ভেতর রাতের ডাক – একটি গ্রামীণ ভৌতিক কাহিনি | Bangla Bhuter Golpo
Top 20 Sunday Suspense Episodes – বাংলা রেডিও রহস্য গল্প | Radio Mirchi